নিউজ ডেস্ক: চ্যানেল উই ফর ইউ
রক্তের গ্রুপ বলতে সাধারণত A, B, AB ও O এবং এর সঙ্গে পজিটিভ বা নেগেটিভ—এই পরিচিত ধরনগুলোর কথাই আমরা জানি। তবে রক্তের শ্রেণিবিন্যাস এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল। মানুষের রক্তে থাকা বিভিন্ন অ্যান্টিজেনের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আরও অনেক বিরল রক্তের ধরন রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দুর্লভ হিসেবে পরিচিত Rh-null, যাকে প্রচলিতভাবে বলা হয় ‘গোল্ডেন ব্লাড’।
কেন নাম ‘গোল্ডেন ব্লাড’?
‘গোল্ডেন ব্লাড’ শুনে মনে হতে পারে এই রক্তের রং সোনালি। আসলে তা নয়। এই রক্তের রংও সাধারণ মানুষের রক্তের মতোই লাল। অত্যন্ত দুর্লভ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে মূল্যবান হওয়ায় এর ডাকনাম হয়েছে ‘গোল্ডেন ব্লাড’।
এর বৈজ্ঞানিক নাম Rh-null। সাধারণ Rh-negative রক্তে শুধু RhD অ্যান্টিজেন থাকে না। কিন্তু Rh-null রক্তে Rh সিস্টেমের কোনো অ্যান্টিজেনই থাকে না। Rh সিস্টেমে ৬০টিরও বেশি অ্যান্টিজেন রয়েছে, যা এই রক্তকে প্রচলিত Rh-positive বা Rh-negative রক্তের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করে তোলে।
কতটা বিরল এই রক্ত?
Rh-null এতটাই বিরল যে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের রক্তের প্রায় ৪৩টি শনাক্তকৃত ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাহিত্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৬১ সালে অস্ট্রেলিয়ার এক নারীর শরীরে প্রথমবারের মতো এই বিরল রক্তের ধরন শনাক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যেও এর সন্ধান পাওয়া গেছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
Rh-null রক্তের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এতে Rh সিস্টেমের অ্যান্টিজেন অনুপস্থিত। ফলে Rh সিস্টেমের অত্যন্ত বিরল রক্তের ধরন থাকা কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এই রক্ত জীবনরক্ষাকারী হতে পারে। বিশেষ পরিস্থিতিতে এটি বিরল রক্তের গ্রুপের রোগীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান বলে বিবেচিত হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে Rh-null রক্ত সব ধরনের রোগীর জন্য সরাসরি ‘ইউনিভার্সাল ব্লাড’। রক্ত দেওয়ার আগে রোগীর রক্তের সঙ্গে দাতার রক্তের সামঞ্জস্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা হয়।
‘গোল্ডেন ব্লাড’ যাদের, তাদের ঝুঁকি কোথায়?
বিরল এই রক্তের অধিকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রয়োজনে উপযুক্ত রক্ত পাওয়া। Rh-null ব্যক্তির শরীরে যদি রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়, সাধারণ Rh-positive বা Rh-negative রক্ত নিরাপদ নাও হতে পারে। তাই জরুরি অস্ত্রোপচার বা গুরুতর রক্তক্ষরণের মতো পরিস্থিতিতে উপযুক্ত রক্ত সংগ্রহ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ কারণে Rh-null রক্তের অধিকারীদের অনেক সময় আগেভাগে নিজের রক্ত সংরক্ষণ করে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সেটি ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে বিরল রক্তের দাতাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শনাক্ত ও সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে তৈরি হয় এই বিরল রক্ত?
Rh-null সাধারণত জিনগত পরিবর্তনের কারণে তৈরি হয়। এটি অত্যন্ত বিরল এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারে বংশগতভাবে দেখা যেতে পারে। গবেষণায় RH ও RHAG-সহ সংশ্লিষ্ট জিনের পরিবর্তনের সঙ্গে এই বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
সাধারণ রক্তের সঙ্গে পার্থক্য
সহজভাবে বললে, আমাদের পরিচিত A+, B-, O+ বা O- রক্তের শ্রেণিবিন্যাস মূলত ABO ও RhD অ্যান্টিজেনের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু Rh-null রক্তে পুরো Rh সিস্টেমের অ্যান্টিজেন অনুপস্থিত থাকে। এ কারণেই এটি এত বিরল এবং একই সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ‘বিশ্বে মাত্র ৪৩ জনের শরীরে আছে’ কথাটি নিশ্চিত বর্তমান মোট সংখ্যা হিসেবে না দেখে, এখন পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানে শনাক্ত বা রিপোর্ট হওয়া মানুষের সংখ্যা হিসেবে দেখা বেশি নির্ভুল। সময়ের সঙ্গে নতুন কেস শনাক্ত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: Cleveland Clinic, Journal of Pakistan Medical Association, International Society of Blood Transfusion এবং Asianet News।