নিউজ ডেস্ক |চ্যানেল উই ফর ইউ,
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের জিডি, উদ্ধার ১৩ হাজার ৬৭
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। তবে এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ এসব শিশু বর্তমানে কোথায় আছে, কী কারণে তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে এবং তাদের কেউ পাচারের শিকার হয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকার কমলাপুর এলাকা থেকে সাত বছরের এক শিশু (ছদ্মনাম অনিক) বাবা-মায়ের সঙ্গে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ট্রেনে উঠে পড়ে। পরে ময়মনসিংহ স্টেশনে নামার পর যাত্রীরা তাকে একা অবস্থায় দেখতে পান। তাদের একজন শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮-এ ফোন করেন।
হেল্পলাইন থেকে শিশুটিকে রেলওয়ে পুলিশের কাছে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে রেলওয়ে পুলিশের তত্ত্বাবধানে তাকে ঢাকায় আনা হয়। এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনে মাইকিং করা হচ্ছিল। স্থানীয় সমাজকর্মীরা বিষয়টি জানতে পেরে যথাযথ প্রক্রিয়ায় শিশুটিকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেন। এর আগে শিশুটির পরিবার থানায় নিখোঁজের ঘটনায় একটি জিডিও করেছিল।
কেন হারিয়ে যায় শিশুরা?
সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের একটি অংশ অভিমান করে বা বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। আবার অনেক শিশু অপহরণ, পাচার, নির্যাতন কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের শিকার হয়।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, নিখোঁজ শিশুদের একটি বড় অংশের বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। তাদের অনেকে বন্ধুদের সঙ্গে পালিয়ে যায়। শিশু নিখোঁজের বিষয়টি পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাদের খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফেরানোর চেষ্টা করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, অনেক শিশু অপহরণের শিকার হয়। এক শ্রেণির মানুষ এসব শিশুকে ভিক্ষাবৃত্তি ও বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করে। পরবর্তী সময়ে তাদের কেউ কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ে।
পাচারের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না-
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালিত হেল্পলাইন ১০৯-এর ইনচার্জ রাইসুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় শিশু অপহরণ বা নিখোঁজ সংক্রান্ত ফোন বেশি আসে। এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হয়।
জরুরি সহায়তা নম্বর ৯৯৯-এও লঞ্চঘাট ও রেললাইন থেকে শিশু হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বেশি ফোন আসে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি নির্যাতনের ভয়, পারিবারিক কলহ কিংবা বিভিন্ন কারণে শিশুরা বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
শিশু পাচারের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের ‘স্টপিং দ্য ট্রাফিকিং’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নারী ও শিশু পাচারের ঝুঁকি হিসেবে জোরপূর্বক শ্রম, যৌন শোষণ, শিশুবিয়ে এবং অনিরাপদ অভিবাসনের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
বাড়ছে নিখোঁজের জিডি-
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে ১৭ হাজার ৮০৮টি জিডি হয়েছিল। ২০২৪ সালে তা কমে ১৬ হাজার ৪১৪টিতে দাঁড়ায়। তবে ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয় ২২ হাজার ৫৫০টি।
পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইন জিডি চালুর ফলে নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি করা সহজ হয়েছে। এ কারণে জিডির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই শুধু নিখোঁজের মোট সংখ্যা দিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন না করে কতজন উদ্ধার হয়েছে এবং কতজন এখনো নিখোঁজ, সেই তথ্যও পাশাপাশি বিবেচনা করা জরুরি।
হারিয়ে যাওয়া শিশুরা কোথায়?
নিখোঁজ হওয়া সব শিশুর জন্য একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের কথা বলা সম্ভব নয়। কেউ পরিবারের কাছে ফিরে আসে, কেউ আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিতদের কাছে আশ্রয় নেয়। আবার কেউ অপহরণ, পাচার, নির্যাতন কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
রাজধানীর কমলাপুরে মেয়েদের সরকারি পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে বর্তমানে ৮০ জন শিশু রয়েছে। তাদের মধ্যে ২০ জন কন্যাশিশু। কেন্দ্রটির ইনচার্জ ও শিশু পুনর্বাসন ব্যবস্থাপক কামরুন নাহার রত্না জানান, সেখানে ৭ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েশিশুরা রয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য পরিবারে পুনর্বাসন করা। তবে অনেক শিশুর ক্ষেত্রে পরিবারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ কম।
মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী দীর্ঘদিন ধরে নারী ও শিশু পাচার নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, বর্তমানে সাইবার অপরাধও শিশু পাচারের বড় একটি ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। শিশুরা ঘরে বসেও নানা ধরনের অনলাইন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কন্যাশিশুদের উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের পরিবারে পুনর্বাসন করা কঠিন হয়ে পড়ে বলেও জানান তিনি।
শিশু পাচার রোধে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেওয়া, এ ধরনের অপরাধ তদন্তে দক্ষ পুলিশ, সাংবাদিক ও সরকারি আইনজীবীর সংখ্যা বাড়ানো এবং শিশু সুরক্ষা বিষয়ে গণমাধ্যমে আরও সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন সালমা আলী। একই সঙ্গে শিশুদের পাঠ্যসূচিতে ঝুঁকি ও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
প্রথম সাত মাসের হিসাবে ২ হাজার ৩৮ শিশুর এখনো সন্ধান না মেলায় প্রশ্ন উঠছে, তারা কোথায়? তাদের কতজন স্বেচ্ছায় পরিবার থেকে দূরে, আর কতজন অপরাধী চক্র বা পাচারকারীদের হাতে পড়েছে—তা খুঁজে বের করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।