নিউজ ডেস্ক |চ্যানেল উই ফর ইউ,
বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বিষয়ে পড়বেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অনেকেই সাংবাদিকতাকে প্রথম পছন্দের তালিকায় রাখেন না। অথচ সংবাদ লেখা, মানুষের গল্প তুলে ধরা, ক্যামেরায় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ধারণ করা কিংবা সমাজের নানা অসঙ্গতি অনুসন্ধানের আগ্রহ থাকলে সাংবাদিকতা হতে পারে সম্ভাবনাময় একটি পেশা।
তবে সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতার কাজের ধরনও বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন তথ্য খোঁজা, নথি বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকারের প্রতিলিপি তৈরি থেকে শুরু করে কনটেন্ট তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের একজন সাংবাদিকের দক্ষতার তালিকায় প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি তথ্য যাচাই ও ডিজিটাল দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী জয় প্রকাশ কিছুদিন আগেও এআইয়ের বিভিন্ন টুলের সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না। পরে ‘ইনফরমেশন ক্রেডিবিলিটি অ্যান্ড এআই লিটারেসি ট্রেনিং’-এ অংশ নিয়ে জেমিনাই, নোটবুকএলএম, পিনপয়েন্ট ও গুগল ট্রেন্ডসের মতো বিভিন্ন টুল ব্যবহার শেখেন।
গুগলের উদ্যোগ ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই প্রশিক্ষণ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুধু নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতেই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ৭২ শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন। প্রশিক্ষণে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি আধুনিক ডিজিটাল টুল ব্যবহারের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চলতি বছরের ১৯ থেকে ২১ এপ্রিল নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয় তিন দিনের ‘জার্নালিজম অ্যান্ড ইনফরমেশন ইন্টেগ্রিটি’ প্রশিক্ষণ।
ডিজিটালি রাইট আয়োজিত এই কর্মসূচিতে অংশীদার ছিল বাংলাদেশে নরওয়ে, ডেনমার্ক ও সুইডেনের দূতাবাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ এতে সহযোগিতা করে।
তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণে অংশ নেন। সেখানে ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণ, ফ্যাক্ট-চেকিং এবং ডিজিটাল ভেরিফিকেশনের বিভিন্ন পদ্ধতি শেখানো হয়।
প্রশিক্ষণের শেষ দিনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এআই প্রযুক্তির ওপর। এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও শনাক্ত করা, বিভিন্ন কনটেন্ট যাচাই করা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি বা বিকৃত তথ্য কীভাবে মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে, সেসব বিষয় হাতে-কলমে দেখানো হয়।
এর আগে ৭ এপ্রিল একই অংশীদারদের উদ্যোগে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও একটি কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল।
তাহলে সাংবাদিকের কাজ কী থাকবে?
এআই খুব দ্রুত দীর্ঘ নথি বিশ্লেষণ করতে পারে, প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে দিতে পারে কিংবা সাক্ষাৎকারের অডিও থেকে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে। কিন্তু সংবাদে কোন প্রশ্নটি করা প্রয়োজন, কোন তথ্য জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন সূত্র কতটা নির্ভরযোগ্য, এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকের বিচারবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মানুষের ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল গল্প প্রকাশের ক্ষেত্রেও কোন তথ্য প্রকাশ করা উচিত এবং কোন তথ্য গোপন রাখা প্রয়োজন, তা বিবেচনা করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ অপরিহার্য।
অর্থাৎ এআই সাংবাদিকের কাজের ধরন বদলে দিতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব—তথ্য যাচাই, জনস্বার্থ বিবেচনা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা—গুরুত্বপূর্ণই থাকবে।
সাংবাদিকতা পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বা সুনাম বিবেচনা করলেই হবে না। সংশ্লিষ্ট বিভাগের পাঠ্যক্রমও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
রিপোর্টিং, ফিচার লেখা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা, মিডিয়া আইন ও নৈতিকতার পাশাপাশি এআই, ডিজিটাল সাংবাদিকতা এবং তথ্য যাচাই শেখানো হয় কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা উচিত।
এ ছাড়া মিডিয়া ল্যাব, ইন্টার্নশিপ এবং পেশাদার সাংবাদিকদের কাছ থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ থাকলে তা একজন শিক্ষার্থীর দক্ষতা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
ভবিষ্যতের সাংবাদিক কেমন হবেন?
চার বছর পর সংবাদকক্ষের প্রযুক্তি আজকের মতো নাও থাকতে পারে। নতুন নতুন এআই টুল আসতে পারে, বদলে যেতে পারে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের পদ্ধতিও।
তবে ভালো প্রশ্ন করার ক্ষমতা, কৌতূহল, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস, মানুষের গল্প বোঝার সক্ষমতা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা একজন সাংবাদিকের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হিসেবেই থাকবে।
তাই এআইয়ের যুগে প্রশ্নটি শুধু ‘সাংবাদিকতা থাকবে কি না’—এমন নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো, নতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে একজন সাংবাদিক কতটা নির্ভরযোগ্য, দায়িত্বশীল, অনুসন্ধানী এবং জনস্বার্থসচেতন হয়ে উঠতে পারবেন।