
মোহাম্মদ উল্যা মিরাজ-
নিউজ ডেস্ক |চ্যানেল উই ফর ইউ,
একটি সংসার ভাঙা কখনোই হঠাৎ ঘটে না। এর পেছনে ধীরে ধীরে জমে ওঠে অভিমান, অবিশ্বাস, ভুল বোঝাবুঝি, অশ্রদ্ধা, দায়িত্বহীনতা কিংবা তৃতীয় পক্ষের অযাচিত হস্তক্ষেপ। সমাজে প্রচলিত একটি কথা—;নারীর শত্রু নারী’। বাস্তব জীবনে এমন কিছু ঘটনা সত্যিই দেখা যায়, যেখানে শাশুড়ি, ননদ, বান্ধবী কিংবা প্রতিবেশী কোনো নারীর নেতিবাচক প্রভাব একটি দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করে। তবে শুধু নারীকে দায়ী করে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। কারণ একইভাবে কোনো পুরুষের হস্তক্ষেপও একটি সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
বর্তমান সময়ে পারিবারিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ঘাটতি। স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, পরনিন্দা, কানকথা, সন্দেহ সৃষ্টি এবং একজনের কথা অন্যজনের কাছে বিকৃতভাবে উপস্থাপন সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে। অনেক সময় সামান্য মতবিরোধও অহংকার ও ভুল বোঝাবুঝির কারণে বড় সংকটে রূপ নেয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করলেও এর অপব্যবহার, অতিরিক্ত আসক্তি, গোপন যোগাযোগ কিংবা ভার্চুয়াল সম্পর্ক অনেক দাম্পত্য জীবনে সন্দেহ ও দূরত্ব সৃষ্টি করছে। তবে মোবাইল নয়, মূল সমস্যা হলো এর দায়িত্বহীন ব্যবহার।
সংসার টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ। এককেন্দ্রিক মনোভাব, রূঢ় আচরণ, অমনোযোগিতা, পরস্পরের অনুভূতিকে অবজ্ঞা এবং সংসারের দায়িত্ব এড়িয়ে চলা ধীরে ধীরে ভালোবাসার জায়গায় বিরক্তি তৈরি করে। আর পরকীয়া যখন কোনো সম্পর্কে প্রবেশ করে, তখন বিশ্বাসের ভিত্তিটিই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো মূল্যবোধের অবক্ষয়। ধর্মীয়, নৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক শিষ্টাচার দুর্বল হয়ে গেলে মানুষ অধিকারের কথা মনে রাখে, কিন্তু দায়িত্বের কথা ভুলে যায়। অথচ একটি পরিবার টিকে থাকে কেবল ভালোবাসায় নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন বিশ্বস্ততা, সংযম, ক্ষমাশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং একে অপরের প্রতি সম্মান।
তাই সংসার ভাঙনের দায় কোনো নির্দিষ্ট নারী বা পুরুষের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে আমাদের ভাবতে হবে সমস্যার গভীরে কোথায়। নারী যেন নারীর প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহমর্মী হন, পুরুষ যেন নারীর মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন এবং স্বামী-স্ত্রী যেন নিজেদের সম্পর্কের বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের অযাচিত প্রভাব থেকে সতর্ক থাকেন।
পরিবার সমাজের প্রথম শিক্ষালয়। একটি সুস্থ পরিবারই গড়ে তুলতে পারে সুস্থ ও মানবিক প্রজন্ম। তাই সংসার রক্ষার সবচেয়ে বড় উপায় পরস্পরকে পরাজিত করা নয়, বরং পরস্পরকে বোঝা; সন্দেহ নয়, বিশ্বাস; অহংকার নয়, বিনয়; আর স্বার্থ নয়, মানবিকতাকে প্রাধান্য দেওয়া।
নারী নয়, পুরুষ নয়—সংসার ভাঙনের প্রকৃত শত্রু হোক মূল্যবোধের অবক্ষয়, আর পরিবার রক্ষার প্রধান শক্তি হোক ভালোবাসা, বিশ্বাস ও মানবিকতা।