
স্বাস্থ্য খাতে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিবছর বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিতে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় রোগীদের ছুটতে হচ্ছে রাজধানী ঢাকায়। এতে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়, ভোগান্তি ও রোগীর চাপ।
কুমিল্লার রাসেল দীর্ঘদিন ধরে কানের সমস্যায় ভুগছেন। স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে একাধিকবার ঢাকায় যেতে হয়েছে। প্রতিবার যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ তার পকেট থেকে বের হয়েছে হাজার হাজার টাকা। রাজধানীতে এসেও হাসপাতালের শয্যা সংকটসহ নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে তাকে।
একই অভিজ্ঞতা নোয়াখালীর সায়েমের। তার ভাইয়ের হাত ভেঙে গেলে তাকে স্থানীয় জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসক সংকট ও অপারেশন থিয়েটার বন্ধ থাকায় অস্ত্রোপচারের জন্য দীর্ঘ সময় পরের তারিখ দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ওই রাতেই ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে যেতে হয় তাদের।
এক দশকেও শেষ হয়নি হাসপাতাল নির্মাণ
রোগীদের ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ২০১৮ সালে যশোর, কক্সবাজার, পাবনা ও নোয়াখালীতে ৫০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার।
প্রকল্পটি ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাত বছর পরও এর অগ্রগতি মাত্র ২৭ শতাংশ। এখন প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ তিন বছরের প্রকল্প শেষ করতে সময় লাগছে প্রায় এক দশক। একই সঙ্গে প্রকল্প ব্যয়ও বাড়ছে ৫৫৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
একই চিত্র আটটি বিভাগীয় শহরে ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পেও। তিন বছরে শেষ করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ ইতোমধ্যে বাড়িয়ে ২০২৮ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে। ফলে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগও দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে।
এদিকে আটটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের সুবিধা আধুনিকায়নের একটি প্রকল্প ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির কাজ হয়েছে ৭৪ শতাংশ।
বরাদ্দের ৬৬ শতাংশ অর্থই অব্যবহৃত
স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্পগুলোর অর্থ ব্যবহারের চিত্রও হতাশাজনক। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ১৯টি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ১২৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯৭৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ১৬টি প্রকল্পের বিপরীতে ১ হাজার ৩৮৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বরাদ্দ পেলেও ব্যয় করেছে ৫১০ কোটি টাকা বা ৩৬ দশমিক ৭২ শতাংশ।
দুই বিভাগ মিলিয়ে ৩৫টি প্রকল্পে মোট ৪ হাজার ৫১৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৪৮৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এডিপির বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৯৪ শতাংশে। ফলে বরাদ্দের প্রায় ৬৬ শতাংশ অর্থই অব্যবহৃত থেকে গেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিস্থিতি ছিল আরও খারাপ। ওই বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের হার নেমে আসে ১৯ দশমিক ৮৭ শতাংশে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রকল্প বাস্তবায়নের হার ছিল ২১ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের ১৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা জটিলতা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির জন্য ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও সরকার পরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতাকে দায়ী করেছেন। এ সময় অনেক প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ থমকে যায়। পাশাপাশি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নির্বাচনসংক্রান্ত ব্যস্ততাও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এর আগের বছরগুলোতেও প্রকল্প বাস্তবায়নের হার সন্তোষজনক ছিল না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, ২০২২-২৩ সালে ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং ২০২১-২২ সালে ৭৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
আইএমইডি ও প্রকল্প পরিচালকদের পর্যালোচনায় প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েকটি বড় সমস্যা উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ঘাটতি, ঠিকাদারদের ধীরগতি, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, অর্থ ছাড়ে জটিলতা, যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করা, নকশা পরিবর্তন, কেনাকাটায় জটিলতা, বারবার দরপত্র আহ্বান, সরকারি আপত্তি এবং ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও আইএমইডির সাবেক সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান বাধা। অনেক সময় সরকারি অর্থের সংস্থান নিশ্চিত না করেই প্রকল্প শুরু করা হয়। এডিপি বাস্তবায়নে শুরু থেকেই কঠোর তদারকি এবং নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধানের পরামর্শ দেন তিনি।
প্রয়োজন প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সংস্কার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো মূলত কাঠামোগত, প্রশাসনিক ও আচরণগত।
তিনি বলেন, সাধারণ সরকারি সেবার তুলনায় স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প অনেক বেশি জটিল। কারণ এখানে ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রযুক্তি, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, কেনাকাটা ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করার বিষয়ও জড়িত। অথচ এসব প্রকল্পকে অন্যান্য সাধারণ সরকারি প্রকল্পের মতো একই কাঠামোয় পরিচালনা করা হয়।
তার মতে, অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে অনেক সময় প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে মাঝপথে প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করতে হয় এবং প্রকল্পের কাজের গতি ও ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।
অধ্যাপক হামিদ বলেন, এসব সংকট নতুন নয়। শুধু প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাঠামোয় মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, স্বাস্থ্য খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরও যদি প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে কবে?